নতুন ইউটিউব ব্যবহারকারীদের কাছে ইউটিউবের অ্যালগরিদম যে ভিডিওগুলো দেখায়, তার ২০ শতাংশেরও বেশি ‘এআই স্লপ’ অর্থাৎ নিম্নমানের এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট। এগুলো মূলত ভিউ বাড়িয়ে অর্থ আয় করার জন্য বানানো হয়। এমন তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়।
ভিডিও এডিটিং প্রতিষ্ঠান ক্যাপউইং বিশ্বের প্রতিটি দেশের শীর্ষ ১০০টি করে মোট ১৫ হাজার জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে ২৭৮টি চ্যানেলে কেবলমাত্র এআই স্লপ কনটেন্টই রয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব এআই স্লপ চ্যানেল এখন পর্যন্ত ৬৩ বিলিয়নের বেশি ভিউ এবং ২২ কোটি ১০ লাখ সাবস্ক্রাইবার অর্জন করেছে। আনুমানিক হিসেবে, এগুলো থেকে বছরে প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার (প্রায় ৯ কোটি পাউন্ড) আয় হচ্ছে।
ক্যাপউইংয়ের গবেষকেরা একটি নতুন ইউটিউব অ্যাকাউন্ট খুলে দেখেছেন, ফিডে প্রস্তাবিত প্রথম ৫০০ ভিডিও’র মধ্যে ১০৪টিই ছিল এআই স্লপ। একই সঙ্গে দেখা গেছে, এই ৫০০ ভিডিওর এক-তৃতীয়াংশ ‘ব্রেইনরট’ ক্যাটাগরির, যার মধ্যে এআই স্লপসহ এমন সব নিম্নমানের কনটেন্ট রয়েছে, যেগুলো মূলত দর্শকের মনোযোগ সৃষ্টি করে আয় করার উদ্দেশ্যে তৈরি।
এই ফলাফল দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকা এক শিল্পের চিত্র দেখাচ্ছে, যা এক্স (সাবেক টুইটার), মেটা ও ইউটিউবসহ বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করছে এবং সংজ্ঞায়িত করছে কনটেন্টের এক নতুন যুগের। যেখানে শুধু রয়েছে প্রেক্ষাপটহীন ও আসক্তিকর কন্টেন্ট।
চলতি বছর দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউটিউবের দ্রুত বর্ধনশীল চ্যানেলগুলোর প্রায় ১০ শতাংশই ছিল এআই স্লপ, যেগুলো প্ল্যাটফর্মটির ‘অপ্রমাণিত কনটেন্ট’ ঠেকানোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও লাখ লাখ ভিউ পেয়েছে।
ক্যাপউইংয়ের চিহ্নিত চ্যানেলগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে এবং সারা বিশ্বেই এগুলো দেখা হচ্ছে। স্পেনে ট্রেন্ডিং এআই চ্যানেলগুলো অনুসরণ করে প্রায় ২ কোটি মানুষ, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। মিশরে এআই চ্যানেলের অনুসারী ১ কোটি ৮০ লাখ, যুক্তরাষ্ট্রে ১ কোটি ৪৫ লাখ এবং ব্রাজিলে ১ কোটি ৩৫ লাখ।
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি দেখা চ্যানেল ‘বান্দার আপনা দোস্ত’, যার অবস্থান ভারত। চ্যানেলটির মোট ভিউ এখন ২৪০ কোটি। এখানে দেখা যায় মানবাকৃতির এক রিসাস বানর এবং ইনক্রেডিবল হাল্ক থেকে অনুপ্রাণিত এক পেশিবহুল চরিত্র, যারা দানবের সঙ্গে লড়াই করে এবং টমেটো দিয়ে তৈরি হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে। ক্যাপউইংয়ের হিসেবে, এই চ্যানেল থেকে সর্বোচ্চ ৪২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। তবে এ বিষয়ে গার্ডিয়ানের প্রশ্নের জবাবে চ্যানেলটির মালিক সাড়া দেননি।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা গবেষক রোহিনী লক্ষণে বলেন, ‘বান্দার আপনা দোস্ত’-এর জনপ্রিয়তার পেছনে এর অদ্ভুততা, অতিমাত্রায় পুরুষালি উপস্থাপনা এবং স্পষ্ট কোনো কাহিনির অভাব বড় কারণ, যা নতুন দর্শকদের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘পাউটি ফ্রেঞ্চি’ চ্যানেলের ভিউ ২০০ কোটির বেশি এবং এটি শিশুদের লক্ষ্য করে তৈরি বলে মনে হয়। এখানে এক ফ্রেঞ্চ বুলডগের অভিযান দেখানো হয়। বিশেষ করে- ক্যান্ডির বন ঘুরে দেখা, ক্রিস্টাল সুশি খাওয়া—যার পটভূমিতে থাকে শিশুদের হাসির শব্দ। ক্যাপউইংয়ের হিসেবে, এই চ্যানেল থেকে বছরে প্রায় ৪০ লাখ ডলার আয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘কুয়েন্তোস ফাসিনান্তেস’ চ্যানেলটিও শিশুদের লক্ষ্য করে কার্টুনধর্মী গল্প দেখায় এবং এর সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৬৬ লাখ ৫০ হাজার, যা গবেষণায় পাওয়া সবচেয়ে বেশি সাবস্ক্রাইবার সংখ্যার চ্যানেল।
এদিকে পাকিস্তানভিত্তিক ‘দ্য এআই ওয়ার্ল্ড’ চ্যানেলে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যার এআই-তৈরি শর্ট ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যার শিরোনাম যেমন ‘Poor People, Poor Family’ বা ‘Flood Kitchen’। অনেক ভিডিওতেই ব্যবহৃত হয় ‘Relaxing Rain, Thunder & Lightning Ambience for Sleep’ নামের সাউন্ডট্র্যাক। এই চ্যানেলের মোট ভিউ ১৩০ কোটি।
ইউটিউবে বিদ্যমান বিপুল কনটেন্টের তুলনায় এসব চ্যানেলের প্রকৃত প্রভাব কতটা তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। ইউটিউব নিজে বছরে মোট কত ভিউ হয় বা এর মধ্যে কতটা এআই কনটেন্ট থেকে আসে সে তথ্য প্রকাশ করে না।
