ভোটের সময় যখন এগিয়ে আসছে ঠিক তখনই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছাড়লেন দলের পরিচিত মুখ ও সংগঠক তাসনিম জারা। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব। নিজের ফেসবুক পেজে নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দলের একাধিক নেতাও। এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন এনসিপির ৩০ কেন্দ্রীয় নেতা। সব মিলিয়ে গতকালের একাধিক ঘটনায় এনসিপির মধ্যে অন্তঃকোন্দল ও ভাঙনের সুর যেন আরো স্পষ্ট হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, আসন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছু বিষয়ে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয় এনসিপির একাংশ। বিশেষ করে ভোট কৌশলকেই সামনে আনা হচ্ছে এক্ষেত্রে। সেই সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য কৌশলগত এ সমঝোতাকে প্রয়োজনীয় বলেও মনে করছে তারা। আবার দলের একটি অংশ মনে করছে, আপসহীন অবস্থান থেকে সরে এসে সমঝোতার রাজনীতিতে গেলে এনসিপির মৌলিক আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ দ্বন্দ্বের মধ্যেই দল ছাড়ার ঘোষণা দেন তাসনিম জারা। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি গড়ার শুরু থেকেই তিনি যুক্ত ছিলেন। অভ্যুত্থানের তরুণ নেতাদের এ দলে দায়িত্ব নেয়ার পর নানা কর্মসূচিতেও সক্রিয় ছিলেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শাপলা কলি প্রতীকে এনসিপি যে ১২২ আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে তার মধ্যে তাসনিম জারাকে ঢাকা-৯ (খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা) আসন দেয়া হয়। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে আসা এবং সমঝোতার ভোট নিয়ে ভিন্নমতকে গুরুত্ব না দেয়ার অভিযোগ তুলে তিনি এনসিপি থেকে সরে দাঁড়ান বলে জানা গেছে।
চিকিৎসক তাসনিম জারা স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা-৯ আসনের অন্তর্ভুক্ত খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদাবাসীর উদ্দেশে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্লাটফর্ম থেকে সংসদে গিয়ে আমার এলাকার মানুষের ও দেশের সেবা করা। তবে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আপনাদের ও দেশের মানুষকে ওয়াদা করেছিলাম যে আপনাদের জন্য এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার জন্য আমি লড়ব। পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, আমি আমার সেই ওয়াদা রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই এ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৯ থেকে অংশগ্রহণ করব।
তানসিম জারার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহ এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক, তিনিও পদত্যাগ করছেন বলে জানা গেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দল ছাড়েন চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতা মীর আরশাদুল হক। দলটির আরো তিন কেন্দ্রীয় নেতা অনিক রায়, তুহিন খান ও অলিক মৃ বিভিন্ন সময় পদত্যাগ করেন। সব মিলিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা তরুণদের দলটি প্রতিষ্ঠার ১০ মাসের মাথায়ই ভাঙনের মুখে পড়ল।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন অবশ্য গতকাল রাতে জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেই জোট করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে এনসিপি। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, ‘ফাইনালি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি জোটে যাচ্ছে। রোববার (আজ) এ জোটের ঘোষণা করা হবে।’
জামায়াতে ইসলামীসহ আটদলীয় জোটের সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার বিষয়ে যদিও আপত্তি জানিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ নেতা। খালেদ সাইফুল্লাহ, মুশফিক উস সালেহীন, আরমান হোসাইন, নুসরাত তাবাসসুমসহ ওই নেতাদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে আপত্তির ভিত্তি হিসেবে এনসিপির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-সম্পর্কিত ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার কথা তুলে ধরেন। তারা লিখেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
এ চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান—বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আমাদের দলের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।’ তাছাড়া ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়া, দেড় হাজার ব্যক্তির কাছে মনোনয়নপত্র বিক্রি, পরে ১২৫ প্রার্থী ঘোষণা এবং এখন ‘অল্প কিছু আসনের’ জন্য জোটে যাওয়ার বিষয়গুলো ‘জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল’ বলেও মনে করছেন তারা।
এ আলোচনার মাঝেই সংস্কার, ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও জোট নিয়ে কথা বলেছেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। দলের ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ঐকমত্য কমিশনে সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গেই অন্য দলগুলোর মতভিন্নতা পরিলক্ষিত হতো। সেখানে সংস্কারের পয়েন্টগুলোয় স্বাভাবিকভাবেই এনসিপি, জামায়াত এবং অন্য দলগুলো একমত হয়েছে। তাই তিনি বলেন, ‘সেক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়, দেশটাকে নতুন করে গড়া, নতুনভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে গড়ে তোলার জন্য যে রাজনীতি, সে রাজনীতির প্রতি যে কমিটমেন্ট সেটাকেই নির্বাচনী রাজনীতিতে জোটের বা সমঝোতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধানতম বিবেচ্য বিষয় হিসেবে মূল্যায়ন করছি।’
নির্বাচনে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে দলটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান মতপার্থক্য সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এনসিপি ব্যর্থ হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান সমন্বয়কারী মীর আরশাদুল হক। পদত্যাগের বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন মাঠে ছিলাম, দলকে সময় দিয়েছি। কিন্তু শেষদিকে দেখলাম এনসিপিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ কমে গেছে। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই বললেই চলে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা আমার কাছে ভুল মনে হয়েছে এবং তৃণমূলের মতামতও প্রতিফলিত হয়নি। এজন্যই আমি সরে এসেছি। ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে নয়, রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে।
তিনি আরো বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন কিনা বা কাউকে সমর্থন করে নির্বাচন ও এনসিপি থেকে সরে গেলেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিইনি। দেশের এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান। এ জায়গা থেকে আমি বিএনপির তারেক রহমানের শান্তির বার্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অবস্থানকে সমর্থন করি। আর আমার পদত্যাগের বিষয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে সব জানিয়েছি। এর বাইরে কিছু বলতে চাই না।
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে এনসিপির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে। বিএনপি নাকি জামায়াত কার সঙ্গে জোটবদ্ধ হবে সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কুমিল্লা-৩ ও ঢাকা-১০ আসনে ভোট করার ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে এনসিপিতে যোগ দেয়ার আলোচনা পোক্ত হলেও আসিফ মাহমুদ ও আরেক সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে মনোনয়ন না দেয়ার শর্ত দেয় জামায়াত। এতে ক্ষুব্ধ হয় দলটির একাংশ। সেই সঙ্গে দলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় একমত না হওয়ায় এনসিপির আরো কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করতে পারেন বলে জানিয়েছেন দলটির এক কেন্দ্রীয় নেতা। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, শুধু তাসনিম জারাই নয়; এনসিপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা আরো তিন-চারজন পদত্যাগ করতে পারেন। এভাবে চলতে থাকলে দল মুক্তোর মালার মতো ঝরে পড়বে।
এনসিপির একাধিক নেতা স্বীকার করেছেন, দলটির ভেতরে বর্তমানে গুরুতর মতানৈক্য বিদ্যমান। তারা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এনসিপির ভূমিকা কী হবে—এ প্রশ্নে দল এখনো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। ফলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, ‘নতুন দল হিসেবে সবার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার এ পথচলায় টানাপড়েন চলছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো ঠিক হয়ে যাবে, সেই সঙ্গে ছোটখাটো মনোমালিন্যও দূর হয়ে যাবে।
সূত্র: বণিক বার্তা
